পাত্রী চাই
সুনীল শর্মাচার্য
পাত্রী চাই
রোববারে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে গণপতির সঙ্গে রমেশবাবু, কার্তিকবাবুর দেখা। প্রতি সপ্তাহে হয়। পাঁচমাথার মোড়ে। তারপর একসঙ্গে মর্নিং ওয়াক করেন। আজ তাঁরা হাঁটতে হাঁটতে ফ্ল্যাট আবাসন ছেড়ে বস্তি এলাকার রাস্তা দিয়ে সবুজ মাঠের দিকে হাঁটতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতে রমেশবাবু বলেন, ‘কোটিপতির ছেলে, তিন কামরার ফ্ল্যাটে থাকে। আর না-কী কান্না কাঁদে। সে অসুখী!’
কার্তিকবাবু বললেন, ‘আর বলবেন না, বস্তির ছেলে, সারাদিন দীঘি আর পার্কে ঘুরে বেড়ায়। মজা করে। সে বড় সুখী!’
গণপতিবাবু বললেন, ‘তো ধনী কে?’
রমেশবাবু বললেন, ‘একটা প্রবাদ আছে, যে ভোগ-দখল করে, মালিক সেই!’
কার্তিকবাবু বলে, ‘পৃথিবীকে ভোগ করছে কে? ধনীর ছেলেটি অথবা বস্তির ছেলেটি?’
গণপতি বললেন, ‘দেখুন, ভোগ-উপভোগ না-করতে পারলে, সম্পদ থেকে লাভ কি? যে সম্পদ
দিয়ে তুমি নিজেকে সুখী, সুস্থ-সবল রাখতে পারো না, সে সম্পদে কাজ কি?’
রমেশবাবু বললেন, ‘ঠিক বলেছেন, পৃথিবীকে উপভোগ করো। রাস্তাঘাট, পার্ক, নদী, দীঘি, আকাশ সব ভোগ করো। ব্যাংকে টাকা থাকলে, তোমার সুখ কি?’
এসব কথা তারা বলতে বলতে এবার বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। পাঁচমাথার মোড়ে এসে চায়ের দোকানে বসে চা খায়।
রমেশবাবু বললেন, ‘গণপতিবাবু, বাড়ি ফিরে আজ নিশ্চয় পাত্রীর বিজ্ঞাপন দেখবেন?’
গণপতিবাবু বলেন, ‘হ্যাঁ দাদা, ছেলেটার জন্য উপযুক্ত পাত্রী পাচ্ছি না! দিনে দিনে কি যে হলো!’
কার্তিকবাবু সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ দাদা, খুঁজুন, ঠিক পেয়ে যাবেন একদিন।’
রমেশবাবু আর কার্তিকবাবুর ছেলে-মেয়েরা সব প্রেম করে বিয়ে করেছে। সরকারি চাকরি করে। ওদের ব্যাপার আলাদা। তার ছেলেটা প্রেম করতেও পারলো না, আবার চাকরি নয়, একটা ছোটখাটো ব্যবসা করে। দীর্ঘশ্বাস চেপে গণপতি চুপ। তারপর যে যার বাড়ির দিকে রওনা হলো।
বাড়ি ফিরে পোশাক পাল্টে, হাতমুখ ধুয়ে গণপতিবাবু রোববারের খবরের কাগজ নিয়ে বসলেন। নোটবুক বের করে রাখলেন। মনমতো পাত্রী যদি মেলে। কিন্তু সব খোঁজাখুঁজি ব্যর্থ হলো। যে ঘটক নিযুক্ত করেছেন, সেও যা বেছে বেছে পাত্রীর সন্ধান দেয়, তা তার কথাবার্তায় অনুসন্ধানে উল্টো।
তিনি এখন জাতপাত এসব দেখছেন না। একটু পছন্দসই হলেই হলো। এবার গোয়েন্দা দৃষ্টি নিয়ে কয়েকটি বিজ্ঞাপন পড়েন :
পাত্র চাই
EB Baldya 43+/5’31/2″ MA BEd 1st Class সরকারি স্কুল শিক্ষিকা। বৈদ্য/Brahmin সুচাকুরে পাত্র কাম্য।
প.ব. বৈদ্য 32/5′ 3″ MA সুশ্রী নরগণ, সিংহরাশি, পিতা মাতার একমাত্র মেয়ে, ৩ মাসের ডিভোর্সি ইসুলেস পাত্রীর শিক্ষিত, মার্জিত ও রুচিশীল সুপ্রতিষ্ঠিত চাকরি/ব্যবসায়ী অনূর্দ্ধ ৪০ পাত্র কাম্য।
বনিক 30/5′ 3″ ফর্সা স্লিম সুশ্রী MA (Eng.) BEd নামমাত্র ডিভোর্সি 38 মধ্যে স./অস. স. চা. পাত্র কাম্য।
Ed বৈশ্য 41/5′ 4″ MTech সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা পিতা ডাক্তার সুশ্রী মধ্যমবর্ণা ডিভোর্সি পাত্রীর জন্য অনুর্ধ্ব 45 উচ্চশিক্ষিত উচ্চপদস্থ স./বেস. চাকুরিরত উপযুক্ত সুপাত্র কাম্য।
WB. 33 ডিভোর্সি 5′ 5″ নরগণ MA BEd (Eng) অতীব সুশ্রী ও ফর্সা পাত্রীর জন্য WB. অনুর্ধ্ব 37, ব্রাক্ষণ ইস্যুলেস পাত্র কাম্য।
Bhrahmin 37+5′ 1″, Nara, Makar, Fsir, Pretty, Mphill, PhD Asst. Prof. in a reputed College of Kolkata, IOLPA, Seeks a qualified and established Groom within 42 Years Caste No Bar.
এতগুলো বিজ্ঞাপন পড়ে মাথা ঘুরতে থাকে গণপতির। বিজ্ঞাপনের বেশিভাগ পাত্রী ডিভোর্সি। এক সংসার ভেঙে আবার নতুন সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখছে। যেমন নারী, তেমন পুরুষ। কেউ আর এক স্বামী, এক স্ত্রীতে সারাজীবন কাটাতে চায় না।
বর্তমান সমাজের চিত্র দেখে গণপতি থ। আবার সবাই সরকারি চাকরির পাত্র চাই। কিন্তু দেশে সরকারি চাকরি কোথায়? বেসরকারি সংস্থাও সব বন্ধের মুখে।
সেখানে সব মেয়ের বাবা-মা চাকরিজীবী জামাতা চান। সমাজ কোথায় গেছে! তার ছেলে তো সামান্য ব্যবসায়ী। আহা মরি না-হলেও দিব্য আছে। কোনো কিছুর অভাব নেই। তবু মনমতো
পাত্রী খুঁজে পারছেন না। এখনকার মেয়েরা খুব সাবধানী। ছেলের মাসিক আয় কত? সংসারে কে কে আছে? সব আদ্যপান্ত খোঁজ নেয়।
প্রেমের বিয়ে হলে এসব নাই। কিন্তু দেখেশুনে হলে কত ফ্যাকনা! সব মেয়েই ইজিগোয়িং লাইফ চায়। ঝুটঝামেলা পছন্দ করে না। ছোট সংসার চাই। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী চাই। এরা কি সংসারী হয়? সংসার ভাঙতেই আসে। তাই এত ডিভোর্স।
এত বিয়ে ভাঙার গল্প। গণপতির মন খারাপ হয়ে যায়। পাত্রী খুঁজে না-পেয়ে নোটবুক বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। রান্না ঘর থেকে গিন্নি ডাকে টিফিন তৈরি খেয়ে নাও।…
…………………
পড়ুন
গল্প
এক সমাজবিরোধী ও টেলিফোনের গল্প : সুনীল শর্মাচার্য
আঁধার বদলায় : সুনীল শর্মাচার্য
অনুগল্প
সংশ্লিষ্ট আরো লেখা
সুনীল শর্মাচার্যের দশটি কবিতা
নাসিমা খাতুনের কবিতা
সুনীল শর্মাচার্যের কবিতা